পানির নিচে বসতঘর, খাবারের কষ্ট কক্সবাজারে

চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের শাকের মোহাম্মদচর পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ হোছাইন। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে তার বসতঘর। পানি ঢোকার পর থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে রান্নার চুলা। গত চার দিন ধরে উনুনে জ্বলেনি আগুন। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে তার মতো অনেক বানভাসি পরিবারের।
মোহাম্মদ হোছাইন বলেন, ‘এখানে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। কিছুই খেতে পারছি না। চারদিকে এত পানি যে এখনো চুলায় আগুন জ্বালিয়ে রান্না করাও সম্ভব হচ্ছে না। সবাই অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে, আর অনেকের ঘরবাড়িও ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের মতোই পেকুয়া, মাতামুহুরি, রামু ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত। এসব এলাকার প্রায় ৬০ শতাংশ জনপদ এখনও পানির নিচে। ডুবে আছে হাজারো ঘরবাড়ি। পানিবন্দি মানুষ এখন কাটাচ্ছেন দুর্বিষহ দিন, চলছে তাদের বেঁচে থাকার লড়াই।
কাকারা এলাকার বাসিন্দা আব্দু রশিদ বলেন, ‘আমরা প্রতিবছরই এই জলাবদ্ধতার কারণে চরম দুর্ভোগের শিকার হই। আমাদের বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যায়, আর আমরা উঁচু মাচার ওপর আশ্রয় নিয়ে থাকতে বাধ্য হই। প্রতিনিয়ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ওঠানামা করাতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়। এত কষ্টের মধ্যেও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা থাকে না। প্রতিটি দিন আমাদের জন্য এক কঠিন সংগ্রাম হয়ে দাঁড়ায়।’
রফিক উদ্দিন বলেন, ‘এই গ্রামে অন্তত ৬০০ থেকে ৭০০ মানুষের বসবাস। বর্তমানে গ্রামের সবাই পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। শুধু মানুষ নয়, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগিসহ সবকিছু নিয়েই আমরা চরম বিপাকে পড়েছি। কোথায় নিয়ে নিরাপদে রাখব, সেটাও বুঝতে পারছি না। চারদিকে পানি, তাই আমরা সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়েছি।’
ইকবাল হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিশুদ্ধ পানি ও পর্যাপ্ত শুকনো খাবার। কারণ প্রায় প্রতিটি বাড়ির মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং রান্নাবান্না করার কোনো সুযোগ নেই। তাই জরুরি ভিত্তিতে তাদের কাছে খাবার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।’
ইয়াছিন আরাফাত বলেন, ‘চকরিয়া উপজেলাকে অবিলম্বে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা উচিত। একই সঙ্গে সরকারের সব পর্যায় থেকে জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণসহায়তা পৌঁছে দেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শুকনো খাবার, ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে। কাকারা, লক্ষ্যারচর, কুয়ারবিলসহ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচটি ইউনিয়নে অবিলম্বে সরকারের বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।’
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষও দেশের অন্যান্য বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের মতোই ভয়াবহ দুর্ভোগের মধ্যে আছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের পরিস্থিতি সেভাবে সবার নজরে আসছে না। তাই আমি মনে করি, পুরো বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়, তাদের এই বন্যা পরিস্থিতির দিকে নজর দেয়া উচিত। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং তাদের দুর্ভোগ সবার সামনে তুলে ধরতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।’
কক্সবাজারে জুলাই মাসের স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাত ৯২৪ মিলিমিটার। অথচ গত এক সপ্তাহেই ঝরেছে ৭০০ মিলিমিটার বৃষ্টি। অতিবর্ষণের কারণে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও, নদী দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সময়মতো স্লুইসগেট খুলে না দেয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে বলে দাবি বানভাসি মানুষের।
এদিকে সব স্লুইসগেট খুলে দেয়া হয়েছে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসক। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘বিগত বছরের গড় বৃষ্টিপাতের রেকর্ড অনুযায়ী, জুলাই মাসে কক্সবাজারে গড়ে ৯২৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গত সাত দিনেই জেলায় প্রায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। অর্থাৎ, পুরো জুলাই মাসে যে পরিমাণ বৃষ্টি হওয়ার কথা, তার প্রায় ৮০ শতাংশই মাত্র সাত দিনের মধ্যে হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি আরও জানান, অতিবৃষ্টির পাশাপাশি বান্দরবানে ভারী বৃষ্টির কারণে মাতামুহুরী নদী দিয়ে নেমে আসা পানির ঢল চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী ও রামু এলাকাকে প্লাবিত করেছে। কক্সবাজার জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় ৬৯টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, গতকাল থেকে বৃষ্টিপাত অনেকটাই কমে এসেছে এবং পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ৩০ লাখ টাকা এবং ৪৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।