The Fall of Granada and the Truth-False of Emotions

উত্তর মরোক্কোর তাংজিয়ার-এর জাবালে মুসা থেকে স্পেনের “জাবালুত তারিক “আজকের বৃটিশ টেরিটরি জিব্রাল্টার– সেখান থেকে মালাগা, সেভিয়া, কর্ডোভা, টলেডো, মাদ্রিদ, আলহামা-ডে-গ্রানাডা, মুরসিয়া হয়ে গ্রানাডাÑÑ এই দীর্ঘ সফরটি কেবল ভ্রমণ নয়, বরং ইতিহাসকে খোঁজার এক নিরন্তর প্রয়াস। মরোক্কো নিয়ে আমার লিখিত বই “মিনার আর মরীচিকা” লেখার পরই সিন্ধান্ত নিয়েছিলাম “টেলস অফ আন্দালুস” নিয়ে কলম ধরব। লন্ডন থেকে পরিবার-পরিজনকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি, শুধু এই প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলো কাছ থেকে দেখার জন্য। সঙ্গী ছিল চকচকে লাল রঙের ২৫ মডেলের একটি স্বয়ংক্রিয় এমজি গাড়ি।

গ্রানাডার উদ্দেশে যাত্রার দিন আকাশ যেন নিজের সমস্ত ভার ঝরিয়ে দিতে চাইছিল। মুষলধারে বৃষ্টি, গাড়ির জানালায় ফোঁটার ছুটে চলা, আর মনের ভেতর অজানা এক শঙ্কাÑÑ এতদূর এসে যদি প্রকৃতিই বাধা হয়ে দাঁড়ায়! কিন্তু স্পেনের বৃষ্টি বাংলাদেশের বর্ষার মতোই এক ধরনের উষ্ণতা বহন করে। ঠাণ্ডা নেই, কাঁপিয়ে দেওয়া ঝড়ো হাওয়া নেইÑ বরং মনে হলো, এই বৃষ্টি যেন ক্লান্ত ভ্রমণকারীর জন্য এক কোমল সান্ত্বনা। সকাল সাড়ে এগারোটায় যখন গ্রানাডার আলহামরার প্রাসাদনগরীতে পৌঁছালাম, প্রকৃতির রূপ যেন হঠাৎ পাল্টে গেল। মেঘের পর্দা সরে গিয়ে তীব্র রোদ নেমে এলো, ভেজা রাস্তা মুহূর্তেই শুকিয়ে চকচকে হয়ে উঠল। মনে হলো যেন প্রকৃতি নিজেই নতুন করে দৃশ্যপট সাজিয়ে দিল।

Dictionaries & Encyclopedias

শৈশব থেকেই ইতিহাসের বইয়ে আলহামরার ছবি দেখে এক অদ্ভুত আকর্ষণ জন্মেছিল। লাল দুর্গ, সোনালি আলো, ফোয়ারা আর সূক্ষ্ম মুরীয় শিল্পকলাÑ সবকিছুই মনে হতো স্বর্গীয়। তখন খলিফা, নাসরিদ বা আন্দালুসের ইতিহাস না বুঝলেও, আলহামরার নাম শুনলেই মনে হতো কোনো গোপন দরজা খুলে যাচ্ছেÑ যেখানে আলো, সঙ্গীত আর পানির শব্দ মিলেমিশে এক অপার্থিব সৌন্দর্য তৈরি করেছে। আজ বাস্তবে দাঁড়িয়ে বুঝলামÑ এটি কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি অনুভবের বিষয়।

আজকের গ্রানাডা একটি প্রাণবন্ত বিশ্ববিদ্যালয় শহর- ব্যস্ত ক্যাফে, রাস্তার সংগীতশিল্পী, পাহাড়ঘেঁষা ঘরবাড়িÑ সব মিলিয়ে জীবন্ত এক আধুনিক নগর। প্রায় আড়াই লাখ মানুষের এই শহরে পর্যটক, গবেষক, ছাত্র ও শিল্পীরা নিজেদের মতো করে শহরটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেও অনুভব করা যায় আরেকটি নীরব স্তরÑ যেখানে সময় ধীরে চলে, আর ইতিহাস নীরবে শ্বাস নেয়। দিনের আলোয় গ্রানাডা সোনালি, সন্ধ্যায় গভীর নীল, আর রাতে যেন রহস্যময় এক আঁধারে মোড়া শহর। এই বর্তমানের ভেতরেই লুকিয়ে আছে অতীতের আরেক গ্রানাডাÑ যাকে দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। যেন আধুনিক শহরের ওপর ভেসে আছে আরেকটি অদৃশ্য শহর। একসময় এটি ছিল আল-আন্দালুসের শেষ আশ্রয়স্থল। কর্ডোভা, সেভিয়া, ভ্যালেন্সিয়া হারিয়ে বহু পরিবার এখানে এসে শেষ শান্তির খোঁজ করেছিল। তাই এই শহরের বাতাসে এখনো মিশে আছে নির্বাসনের দীর্ঘ আর্তি।

History

মধ্যযুগের গ্রানাডা ছিল এক অনন্য সৌন্দর্যের প্রতীকÑ পর্বত, নদী এবং সূক্ষ্ম জ্যামিতিক স্থাপত্যের এক অপূর্ব সমন্বয়। পুরোনো ভূগোলবিদরা লিখেছেন, এই শহরের সৌন্দর্য শব্দে প্রকাশ করা কঠিন। আজও মনে হয়Ñ গ্রানাডা শুধু দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়।

তবুও এই সৌন্দর্যের নিচে লুকিয়ে আছে এক নীরব পরাজয়ের ছায়া। ১৪৯২ সালের সেই জানুয়ারির সকালে যখন মুসলিম শাসনের পতাকা নামিয়ে দেওয়া হলো, ইতিহাস যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল। কিন্তু পতন মানেই ধ্বংস নয়Ñ কখনো কখনো পতনের মধ্যেও থাকে এক অবিনশ্বর আলো। গ্রানাডা তারই উদাহরণ।

প্রাসাদের প্রধান ফটক পেরিয়ে নাসরিদ প্রাসাদের দিকে এগোতে এগোতে মনে হয় যেন সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটছি। কমলা লেবুর বাগান, ছোট ফোয়ারা, জলধারার শব্দ- সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। মেক্সুয়ার অংশে দাঁড়িয়ে মনে হয় যেন ইতিহাসের আদালতে উপস্থিত আছি। কোমারেস প্রাসাদের ছাদে নক্ষত্রমণ্ডল, প্যাটিওর পানিতে আকাশের প্রতিফলনÑস্থাপত্যও প্রকৃতির এক নিখুঁত মিলন।

এই সমস্ত সৌন্দর্যের মাঝেই মনে পড়ে গ্রানাডার পতনকে ঘিরে প্রচলিত একটি গল্পÑ যে নাকি ১ এপ্রিল ঘটেছিল এবং সেটিই “এপ্রিল ফুল” দিবসের সূচনা। কিন্তু ইতিহাসের আলোকে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বাস্তবে গ্রানাডার পতন ঘটে ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি, যখন শেষ মুসলিম শাসক মুহাম্মদ দ্বাদশ আত্মসমর্পণ করেন। চুক্তিতে মুসলিমদের ধর্ম, সম্পদ ও অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি থাকলেও পরে তা ভঙ্গ করা হয়। দমননীতি, জোরপূর্বক ধর্মান্তর এবং আরবি গ্রন্থ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে।