মালয়েশিয়ায় অভিবাসী শ্রমিকরা পুলিশি ‘নির্যাতনের’ পাশাপাশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এমন অভিযোগ তুলে সম্প্রতি আলজাজিরার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকার দেয়ার অপরাধে বাংলাদেশী প্রতিবাদী রায়হান কবিরকে পুলিশ গ্রেফতার করে ১৪ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমির হামজা জয়নুদ্দিন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তদন্তে সহায়তা করার জন্য শনিবার থেকে তার ১৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে এবং আমরা যথাযথ তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবো।
এ দিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন রায়হান কবিরের আটকের বিষয়টি যাচাইঅন্তে তাকে আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানিয়েছেন। পাশাপাশি রায়হান কবিরের গ্রেফতারে নিন্দা জানিয়েছে অভিবাসন খাতের ২১টি সংগঠন। তারা রায়হানের নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত তার মুক্তির দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতি প্রদানকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে রামরু, ওয়্যারবি, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, (এমজেএফ) ওকাপ, বিএনএসকে, আইআইডি, আসক, বমসা, বাসুগ, ইনাফি, কর্মজীবী নারী, বিএনপিএস, ডেভকম, ইমা, আওয়াজ ফাউন্ডেশন।
অপর দিকে রায়হানের পক্ষে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন মালয়েশিয়ার দু’জন আইনজীবী। মালয় মেইল জানিয়েছে, দুই ফার্মের দুই আইনজীবী শনিবার রাতে জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ এবং রয়্যাল মালয়েশিয়া পুলিশকে রায়হানের আইনজীবী হিসেবে তাদের নিয়োগের বিষয়ে অবগত করেছেন। চিঠিতে আমরা আমাদের ক্লায়েন্টের সাথে দেখা করার তারিখ চেয়েছি, সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলেন দুই আইনজীবী। তারা বলেন, সোমবার বেলা ২টার দিকে আমরা বুকিত আমানে থাকব।
৩ জুলাই আলজাজিরার ইংরেজি অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে ‘লকডআপ ইন মালয়েশিয়ান লকডাউন’ শীর্ষক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচার হয়। ২৫ মিনিটের ওই প্রতিবেদনে করোনাভাইরাস মহামারীতেও মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের সাথে সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন প্রতিবাদী রায়হান কবির। প্রতিবেদনটি প্রচার হওয়ার পর থেকেই সাক্ষাৎকার দেয়া বাংলাদেশী তরুণ রায়হান কবিরকে গ্রেফতারে অভিবাসন পুলিশ ও গোয়েন্দারা সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। একই সাথে তাকে ধরিয়ে দিতে ইমিগ্রেশন পুলিশের ওয়েব সাইটে রায়হান কবিরের ছবি, নাম ঠিকানাসহ বিস্তারিত পরিচয় তুলে ধরা হয়। ব্যাপক গোয়েন্দা অনুসন্ধানের পর অভিবাসন ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের দল ২৪ জুলাই (শুক্রবার) সন্ধ্যার দিকে কুয়ালালামপুরের একটি কনডোনিয়াম থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এর পরই মাালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক সাংবাদিকদের কাছে গ্রেফতারের বিষয়টি স্বীকার করে বলেছিলেন, রায়হান কবিরকে তার দেশে ফেরত পাঠানো হবে। এমন বক্তব্য দেয়ার পর শনিবার অভিবাসন পুলিশ রায়হানকে ১৪ দিনের পুলিশি রিমান্ডে নেয়ার জন্য আদালতে আবেদন জানায়। আদালত তাকে রিমান্ডে নেয়ার আবেদন মঞ্জুর করে। এর পরই আলজাজিরায় সম্প্রচারিত প্রতিবেদনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে।
এ দিকে বাংলাদেশ কমিউনিটি সূত্রে জানা গেছে, আলোচিত বাংলাদেশী রায়হান কবিরের গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের বন্দরে। তার বাবা শাহ আলম একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। ২০১৪ সালে তোলারাম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর তিনি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের একজন বাংলাদেশীর আউট সোর্সিং কোম্পানির মাধ্যমে রায়হান কোতায়ারার বাংলা মার্কেটের একটি দোকানে কাজ নেন। সেখানেই আলজাজিরার প্রতিবেদকের সাথে তার পরিচয় হয়। একপর্যায়ে রায়হান অভিবাসীদের স্বার্থে সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন।
গতকাল কুয়ালালামপুর থেকে বাংলাদেশ কমিউনিটির পরিচিত মুখ নাম না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, রায়হান কবির সাক্ষাৎকারে যা যা বলেছিল তার সবটাই সে সত্য কথা বলেছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সবখানে তো আর সব কথা বলা যায় না! তার ১৪ দিনের রিমান্ড শেষে দেশে ফেরত পাঠানো হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে স্টেটম্যান দেয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন চমৎকার। রায়হান কবির ইস্যুতে বাংলাদেশ হাইকমিশনকে কোনো ধরনের কথা না বলারও নির্দেশনা দেয়া আছে।
গতকাল রায়হান কবিরের গ্রেফতার ও রিমান্ডের বিষয়ে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের শ্রম উইংয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করার পরও সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আহমদ মুনিরুছ সালেহিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে টেলিফোন ধরেননি। পরে তার মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়।
গতকাল রোববার সন্ধ্যার দিকে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশ কমিউনিটির একজন সদস্য জানান, রায়হান কবির গ্রেফতার হওয়ার আগে তিনি নিজেই ওই সাক্ষাৎকারের ভিডিও তার ফেসবুকে আপলোড করেছিলেন। সেই ভিডিওটি মালয়েশিয়াতে ভাইরাল হয়ে গেছে। সেখানে রায়হান বলেছেন, ‘আমি যেকোনো সময় গ্রেফতার হতে পারি। তাই আমি আলজাজিরায় যা বলেছি সমস্ত ওয়ার্কারদের পক্ষে সত্য কথাই তুলে ধরেছি। আমি জানি যেকোনো সময় আমার সমস্যা হতে পারে। আমি পৃথিবীর কোটি বাংলাদেশী প্রবাসীর সমর্থন চাই। কারণ আমি কোনো অন্যায় কাজ করিনি। আল্লাহ আমার সহায় হবেন।’
গতকাল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) কাজী আরফান আশিক স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার প্রদান করায় বাংলাদেশী তরুণ রায়হানের ব্যক্তিগত তথ্য চেয়ে সমন জারি ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয় মালয়েশিয়ান প্রশাসন। শুধু সাক্ষাৎকার প্রদান করায় এভাবে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে খোঁজা, ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করা ও পরবর্তীতে গ্রেফতারের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে অভিবাসন বিষয়ক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বেশ কিছু সংগঠন। এ দিকে দেশে থাকা তার পরিবারও গভীর উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। রায়হানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও নাই মর্মে গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন রায়হানের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।