একটা প্রচলিত প্রবাদ বাক্য আছে ‘শেষ ভালো যার, সব ভালো তার।’ বাংলাদেশ ক্রিকেটের বেলায় আদৌ কি তা খাটে? বছরের শেষ দিকে এসে দুর্দান্ত কিছু অর্জন দেখা মিললো যদিও, তাতে কি ‘ভালো’ তকমা দেয়া যায়? প্রবল আকাঙ্খিত বিশ্বকাপটাই যে ধূসর ছিলো বাংলাদেশের!
হারিয়ে গেল বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যস্ততম বছর। পাওয়া-না পাওয়ার মিশ্র অনুভূতি সাথে নিয়েই বিদায় নিয়েছে ২০২৩ মৌসুম। এশিয়া কাপ, বিশ্বকাপ আর নানা ঘটনায় বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল এই সময়টা। যেখানে মাঝে মাঝে হাসলেও বাংলাদেশ, বেশিরভাগ সময়টা ছিল হতাশা ঘেরা।
২০২৩ সালের প্রথম দুই মাসে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছিল না বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের। এরপর অবশ্য ব্যস্ততা অবসর দেয়নি আর। মার্চের ১ তারিখে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে দিয়ে শুরু ব্যস্ততার শেষ হয়েছে একদম বছরের শেষ দিনে, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি দিয়ে।
এই সময়েই অবশ্য বাংলাদেশ দল গড়ে ফেলেছে ইতিহাস। ম্যাচ খেলার দিক থেকে প্রথমবার পূরণ করেছে অর্ধশতক। তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটে সারা বছরে খেলেছে সমান ৫০টি ম্যাচ। ১৯৮৬ সালে ক্রিকেটে পা রাখা বাংলাদেশ নিজেদের ইতিহাসে আগে কখনো এক বছরে এতো ম্যাচ খেলেনি। আগের সর্বোচ্চ ৪৬টি ম্যাচ ছিলো ২০২১ ও ২০২২ সালে।
বছরের শুরুটা হয়েছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ওয়ানডে সিরিজ দিয়ে। সেখানে যদিও প্রত্যাশা মেটাতে পারেনি দল, জয় আসে এক ম্যাচে। তবে টি-টোয়েন্টি সিরিজে থ্রি লায়ন্সদের হোয়াইট ওয়াশ করে টাইগাররা। আর শেষটা হলো নিউজিল্যান্ডের মাটিতে প্রথমবার কোনো ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ম্যাচ জয়ের স্বাদ নিয়ে।
সাদা পোশাকে বিবর্ণ বাংলাদেশের চিত্রটা কিছুটা হলেও বদলেছে গত বছরে। ২০২৩ সালে খেলা চার টেস্টের মধ্যে তিনটিতেই জিতেছে বাংলাদেশ। এর মাঝে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সাবেক চ্যাম্পিয়ন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও জয় পেয়েছে টাইগাররা। আর আফগানিস্তানকে হারায় টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়ের রেকর্ড গড়ে।
২০১৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ওয়ানডে ফরম্যাটে মাত্র একটি সিরিজ হেরে ঘরের মাঠকে নিজেদের দুর্গে পরিণত করেছিল বাংলাদেশ। অপরাজেয় হয়ে উঠেছিল নিজেদের ডেরায়। কিন্তু ২০২৩ সালে এসে সেই দর্পন চূর্ণ হয়। ঘরের মাঠে সিরিজ হারতে হয়েছে আফগানিস্তানের মতো দলের বিপক্ষেও!
ঘরের বাহিরের অবস্থা আরো নাজুক। এশিয়া কাপে ভরাডুবি বলেও ভারতকে হারিয়ে তা চাপা পড়ে যায়। তবে বিশ্বকাপে ৯ ম্যাচে জয় আসে মাত্র দু’টি। লজ্জায় মাথা কাটা যায় নেদারল্যান্ডসের মতো দলের বিপক্ষে হেরে। সব মিলিয়ে ২০২৩ সালে ৩২টি ওয়ানডের মাঝে ১১ জয়ের বিপরীতে হার ১৮টিতে। তিনটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়।
তবে বাংলাদেশ সফলতার মুখ দেখে টি-টোয়েন্টিতে। ২০২২ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভরাডুবির পর সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে এই ফরম্যাটে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ডের মতো দলের পাশাপাশি আফগানিস্তান, আয়ারল্যান্ডকেও টি-টোয়েন্টিতে হারায় টাইগাররা। সব মিলিয়ে ১১ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ৮ জয় বাংলাদেশের, হার মাত্র দু’টি। অপরটা পরিত্যক্ত হয়।
২০২৩ সালে টেস্ট ও ওয়ানডে ফরম্যাটে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। চার টেস্টে তিন শতকে তার রান ৪৪০। ওয়ানডেতে করেন ২৭ ম্যাচে দু’টি সেঞ্চুরি ও ৮টি হাফ সেঞ্চুরিতে ৯৯২ রান। টি-টোয়েন্টিতে শান্ত ছিলেন দুই নম্বরে, যেখানে তার রান সংখ্যা ২১৮।
২০২৩ সালে ব্যাট হাতে দ্বিতীয় সেরা মুশফিকুর রহিম। অভিজ্ঞ এই ব্যাটার টেস্টে করেছেন ৩৫৫ রান। আর ওয়ানডেতে ২৬ ম্যাচে প্রায় ৩৭ গড়ে করেছেন ৮৪৬ রান। ওয়ানডেতে তৃতীয় সর্বোচ্চ ৭৩৫ রান করেছেন সাকিব আল হাসান। আর টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ ৩২৪ রান করেছেন লিটন দাস।
বোলিংয়ে দেশের সেরা তাসকিন আহমেদ। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে তার উইকেট সংখ্যা ৪৬টি। টেস্টে ৪ ও ওয়ানডেতে পেয়েছেন ২৬ উইকেট। টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ ১৬ উইকেট তার। তবে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ ৩২ উইকেট নিয়েছেন শরিফুল ইসলাম। টেস্টে সবচেয়ে বেশি উইকেট স্পিনার তাইজুল ইসলামের। চার টেস্টে তার উইকেট সংখ্যা ২৬।
সাকিব আল হাসান বছর শুরু হবার আগে বলেছিলেন, ২০২৩ সালটা হবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা বছর। কাগজে কলমে যদিও তাই, তবে বিশ্বকাপ ব্যর্থতা যেন তাতে জয় দিয়েছে। এখন দেখার বিষয় নতুন বছরে সমর্থকদের কি উপহার দেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট।